ধারাবাহিক
দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ২৩
মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।
৬. ব্রিটিশ রাজের ছায়া
প্রেসিডেন্সির পশ্চিমে মাদ্রাজ। নীলগিরি পাহাড়ের চূড়ায় উটাকামান্ড। সবার কাছে উটি নামে পরিচিত। এটি ছিল প্রেসিডেন্সির গ্রীষ্মকালীন আবাস। গ্রীষ্মের ভ্যাবসা গরম থেকে বাঁচতে ইংরেজ সাহেবরা এখানে আসতেন পরিবার নিয়ে।
পাহাড়ের ঠিক উল্টো পাশে, উত্তর থেকে দক্ষিণে লম্বালম্বি বিস্তৃত ছিল মালাবার উপকূল। ভেজা, বৃষ্টিপ্রবণ এক রহস্যময় ভূমি। ঘন গাছপালা, গোলমরিচ, জায়ফল ও অন্যান্য মসলায় সমৃদ্ধ এই অঞ্চলই ইউরোপীয়দের প্রথম আকৃষ্ট করে ভারতের প্রতি। পাশেই মহীশূরের১ গভীর জঙ্গল। চন্দন কাঠ, শিশুগাছ (রোজউড), বাঘ ও হাতির মতো সব বন্য প্রাণীর আস্তানা এখানে। এই জঙ্গল ইংরেজদের কল্পনার জগৎকে বাস্তবে রূপ দিত।
ভারতে ব্রিটিশদের পদচিহ্ন পড়ে ১৬০০ সালে, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি২ গঠিত হয়। এই উপমহাদেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য টানা দুই শতাব্দী ফরাসি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ৩ এবং অন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছে ব্রিটেন। শেষ পর্যন্ত ১৮৭৬ সালে তারা ভারতকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ করে নেয়।
১৯১২ সাল। সিপাহি বিদ্রোহের৪ পর কেটে গেছে পঞ্চাশ বছরেরও বেশি। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীরা এই বিদ্রোকে বলেন ভারতের প্রথম স্বাধীনতা যুদ্ধ। ঠিক এক বছর আগে ভারতে আসেন ব্রিটেনের রাজা পঞ্চম জর্জ৫। বোম্বেতে তাঁর সম্মানে তৈরি গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া৬ দিয়ে তিনি হেঁটে যান। নতুন রাজধানী দিল্লিতে গিয়ে নিজেকে ভারতের সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করেন। তখন ব্রিটিশ শাসকদের কাছে ভারত মানেই ব্রিটেনের অধীনে থাকা একটি দেশ। ব্রিটেন ছাড়া ভারতের কথা কল্পনাও করা যেত না। তৎকালীন ভাইসরয় লর্ড কার্জন স্পষ্ট করেই বলেছিলেন, ‘ব্রিটেন ছাড়া ভারতের কথা বলা মানে বিশ্বাসঘাতকতা।’
ভারতে ব্রিটিশদের পদচিহ্ন পড়ে ১৬০০ সালে, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গঠিত হয়। এই উপমহাদেশ নিয়ন্ত্রণের জন্য টানা দুই শতাব্দী ফরাসি, ওলন্দাজ, পর্তুগিজ এবং অন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছে ব্রিটেন।
কে তখন ভেবেছিল, একদিন গান্ধী৭ এবং নেহরুর৮ নেতৃত্বে এই ভারতকেই রানীর হাত থেকে ছিনিয়ে নেবে? কেউ ভাবেনি ভারত ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের শিকল ভেঙে বেড়িয়ে আসবে। তখন ব্রিটিশ শাসকেরা নিজেদের শক্ত অবস্থানেই দেখেছিল। কিন্তু তারাই যে ভারতবর্ষের শেষ শাসক ছিল, তা হয়তো আন্দাজ করতে পারেনি।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, ভারতের মতো এত বড় দেশটা শাসন করত মুষ্টিমেয় কয়েকজন শাসক। পুরো ভারতের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড ছিল ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস৯ বা আইসিএস। সারা দেশে আইসিএস কর্মকর্তার সংখ্যা ছিল মাত্র এক হাজার। এত অল্প মানুষ দিয়েই তারা বিশাল দেশটা চালাচ্ছিল।
আইসিএসকে বলা যায় ব্রিটিশ শাসনের স্নায়ুতন্ত্র। তাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসে, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ভারতীয় কেরানি, ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও পুলিশেরা। ভাইসরয় কিংবা বড় প্রদেশগুলোর গভর্নরেরা আইসিএস কর্মকর্তা ছিল না, কিন্তু বাকি সব গুরুত্বপূর্ণ পদে তারাই ছিল।
এই সার্ভিস শুরু হয় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসায়িক কর্মচারীদের মাধ্যমে। ১৮৫৩ সাল থেকে ভারতীয়দেরও চাকরির সুযোগ দেওয়া হয়। তবে সেজন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় বসতে হতো। তাই বাস্তবে খুব কম ভারতীয়ই এখানে ঢুকতে পারত। পুরো দেশে তাঁদের সংখ্যা কখনোই কয়েক ডজনের বেশি হয়নি। এমনকি তাঁরা ব্রিটিশ অফিসারদের তুলনায় বেতনও কম পেতেন—তিন ভাগের দুই ভাগ।
আইসিএসকে বলা যায় ব্রিটিশ শাসনের স্নায়ুতন্ত্র। তাদের কাছ থেকে সিদ্ধান্ত আসে, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে ভারতীয় কেরানি, ব্রিটিশ ইঞ্জিনিয়ার, ডাক্তার ও পুলিশেরা।
বর্তমানে সিভিল সার্ভিসের কথা শুনলেই যে অদক্ষতা ও গড়পড়তা মানের কথা মনে হয়, আইসিএসের সঙ্গে এদের শুধু নাম ছাড়া আর কিছুতে মিল ছিল না। এখানে আসতেন ব্রিটেনের সবচেয়ে মেধাবী মানুষেরা। তাঁরা অভিজাত পরিবার থেকে আসতেন, পড়াশোনা করতেন অক্সফোর্ড বা কেমব্রিজে। কঠিন পরীক্ষায় পাস করে তবেই মিলত এই চাকরি।
অবসরে সময়ে তাঁরা সংস্কৃত থেকে বই অনুবাদ করেন, মন্দিরের শিলালিপি১০ পাঠোদ্ধার করেন, ব্যাকরণ লেখেন বা অভিধান সংকলন করেন। নিজেদের প্লেটোর আদর্শ শাসক মনে করতেন তাঁরা। দায়িত্ববোধ ও ন্যায়বোধের কারণে দক্ষ ও নিষ্ঠাবান প্রশাসক হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিলেন।
তবে আইসিএস কর্মকর্তাদের আরেকটি দিক অনেকের কাছেই বিরক্তিকর মনে হতো। তাঁরা নিজেদের খুব নৈতিক ও শ্রেষ্ঠ ভাবতেন। এক ধরনের আত্মতৃপ্তি ও নৈতিক অহংকার কাজ করত তাঁদের মধ্যে। তখনকার এক অবসরপ্রাপ্ত আইসিএস কর্মকর্তা লেখেন, ‘ব্রিটিশ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পেলে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ হয়ে ওঠে, বেশি বেতন পায় বলে দুর্নীতিতে জড়ায় না; এমনকি আত্মীয়স্বজনের অনুরোধেও সিদ্ধান্ত বদলায় না। অল্প সম্পদ নিয়েও তারা খুব কার্যকরভাবে সরকার গঠন করেছিল।
কাগজে-কলমে কথাটা ঠিকই মনে হয়, কিন্তু বাস্তবে ছবিটা ছিল ভিন্ন। জেলা পর্যায়ে সরকারের প্রতিনিধি ছিলেন কালেক্টর। তাঁর ক্ষমতা ছিল রাজার মতো। অথচ উনিশ শতকের শেষের দিকের লেখকেরা লিখেছেন, কালেক্টর১১ ও তাঁর ইংরেজ সহকারীরা স্থানীয় ভাষা প্রায় জানেনই না। সাধারণ মানুষ তাদের ভয় পেত, ভালোবাসত না।
তখনকার এক অবসরপ্রাপ্ত আইসিএস কর্মকর্তা লেখেন, ‘ব্রিটিশ কর্মকর্তারা দায়িত্ব পেলে স্বাভাবিকভাবেই দক্ষ হয়ে ওঠে, বেশি বেতন পায় বলে দুর্নীতিতে জড়ায় না।'
আরেকজন লিখেছেন, কালেক্টরের সঙ্গে দেশের মানুষের একটা অদৃশ্য দেয়াল ছিল। সে দেয়াল ভেদ করে যাওয়া যেত না। ভারতীয়দের চোখে ইংরেজ কর্মকর্তা ছিলেন অদ্ভুত, দুর্বোধ্য এবং দূরের মানুষ।
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল এই দূরত্ব। মাদ্রাজের ফোর্ট সেন্ট জর্জের পুরোনো ছবিতে দেখা যায়, ব্রিটিশদের জীবন ভারতীয়দের বাস্তব জীবনের থেকে অনেক আলাদা এবং সাজানো-গোছানো। যেন এক টুকরো ইংল্যান্ড।
একটি ছবিতে দেখা যায়, পাগড়ি পরা ভারতীয়রা এক সাপুড়েকে ঘিরে আছে, আর দূরে দোতলার বারান্দা থেকে এক ইংরেজ ভদ্রলোক তা দেখছে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে। ছবিগুলোতে ভারতীয়রা কাজ করছে, পালকি বইছে, মাথায় বোঝা তুলছে বা উত্তাল ঢেউয়ে নৌকা ঠেলছে; কিন্তু ইংরেজরা সব সময় আরামে, রোদ থেকে বাঁচতে ছাতার নিচে, কিংবা টপ হ্যাট পরে স্তম্ভে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একজন ইংরেজ সাহেবের নিজস্ব ধোপা থাকাটাই ছিল তখন নিয়ম। মাসে চার-পাঁচ টাকা বেতনে সে সাহেবের বাড়িতেই থাকত, অনেকটা ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতো। ধীরে ধীরে তারা মানুষ থেকে যেন আসবাবের মতো কিছু একটা হয়ে যেত। ভারতে থাকতে থাকতে সাহেবরা একসময় জামাকাপড় ধোঁয়ার মতো সাধারণ কাজও ভুলে যেত। দেশে ফেরার পর স্টিমারে কোনো ইংরেজ স্টুয়ার্ড১২ যখন নিচু হয়ে তাকে চা এগিয়ে দিত, তখন তারা অবাক হয়ে যেত। বহু বছর পর এশিয়া ও আফ্রিকার সাবেক কলোনির ছাত্রদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইংল্যান্ডের কোন জিনিসটা তাদের সবচেয়ে বেশি অবাক করেছে। তারা প্রায় সবাই একই কথা বলেছিল, সাদা চামড়ার মানুষকে কায়িক পরিশ্রম করতে দেখা।
একটি ছবিতে দেখা যায়, পাগড়ি পরা ভারতীয়রা এক সাপুড়েকে ঘিরে আছে, আর দূরে দোতলার বারান্দা থেকে এক ইংরেজ ভদ্রলোক তা দেখছে ছাতার নিচে দাঁড়িয়ে, নিরাপদ দূরত্বে থেকে।
ইংরেজ ও ভারতীয়দের মধ্যে যে বিশাল পার্থক্য ছিল, তা স্বীকার করতে ব্রিটিশরা বেশ আগ্রহী ছিল। কিপলিং১৩ লিখেছিলেন, ‘পূর্ব পূর্বই, পশ্চিম পশ্চিমই, দুজনের কখনো দেখা হবে না।’ হার্বার্ট কম্পটন১৪ লিখেছিলেন, ‘ভারতীয়রা হয়তো তোমার জন্য কাজ করবে, তোমার বাসায়ও থাকবে; কিন্তু সাদা ও কালোদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক তৈরি হবে না। অনুভূতি, সহানুভূতি, অভ্যাস—সব দিক থেকেই তারা পরস্পরের কাছে বিদেশি। কোনো ভারতীয় বন্ধু যত ঘনিষ্ঠই হোক, মাঝে একটা অদৃশ্য খাদ থেকে যায়। জাত ও প্রথার সেই খাদ কোনো ঘনিষ্ঠতাই পার হতে পারে না। পরস্পরের সঙ্গে মিশে যাওয়াই যেখানে অসম্ভব, সেখানে গভীর আত্মীয়তার প্রশ্নই আসে না।
ভবিষ্যতে এই দূরত্বের সামনেই রামানুজনকে দাঁড়াতে হবে। তিনি রানী ভিক্টোরিয়ার আমলে বড় হয়েছেন। তাঁর পকেটের কয়েনে ব্রিটিশ শাসকের ছবি থাকত। ১৯০২ সাল পর্যন্ত রানী ভিক্টোরিয়ার, পরে রাজা সপ্তম এডওয়ার্ডের। হাইস্কুলে তাঁর পাওয়া পুরস্কারের মধ্যে ছিল ইংরেজি দেশপ্রেমের কবিতা, লর্ড ম্যাকাওলের১৫ প্রবন্ধসমগ্র এবং ওয়ার্ডসওয়ার্থের১৬ কবিতার বই। নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে কোনো ভারতীয় সাহিত্য ছিল না। পরে কুম্বকোনম গভর্নমেন্ট কলেজে পড়ার সময় নতুন ছাত্রাবাস তৈরির জন্য যে ৬০ হাজার টাকা তোলা হয়েছিল, তা কোনো ভারতীয় মনিষীর স্মরণে নয়, রানি ভিক্টোরিয়ার স্মরণে।
তবুও এতদিন ইংল্যান্ড ছিল রামানুজনের কাছে শুধুই প্রতীক বা বিমূর্ত ধারণা। ইংরেজদের তিনি খুব একটা চিনতেন না। কিন্তু এখন সব বদলাতে শুরু করেছে। বন্ধু নরসিংহ তাঁকে মাদ্রাজ ক্রিশ্চিয়ান কলেজের ই. বি. রসের১৭ সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের ই. ডব্লিউ. মিডলমাস্টের সঙ্গে দেখা করে তিনি সুপারিশপত্র নিয়েছেন। আর এখন পোর্ট ট্রাস্টে পরিচিত হলেন স্যার ফ্রান্সিসের সঙ্গে। শিগগিরই তিনি তাঁর বন্ধুদের সঙ্গেও পরিচিত হবেন।
রামানুজনের মেধা সম্পর্কে ব্রিটিশদের দৃষ্টিভঙ্গি যতই কুসংস্কারে আচ্ছন্ন থাক না কেন, তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা নিয়ে তাদের কোনো সন্দেহ ছিল না। এই সময় একজন ইংরেজ লেখক রামানুজন সম্পর্কে লিখেছিলেন, ‘তর্কে সে ধূর্ত এবং লড়াকু। শিক্ষিত হলে তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা আরও বাড়তে পারে। তাঁর ভদ্রতাও ইংরেজদের লজ্জায় ফেলে দেয়। ভারত সরকারের সব পদে পরীক্ষা দিয়ে চাকরির সুযোগ থাকলে প্রসাসন হয়তো বাঙালি বাবু ও মারাঠা ব্রাহ্মণে ভরে যেত।’
হাইস্কুলে রামানুজনের পাওয়া পুরস্কারের মধ্যে ছিল ইংরেজি দেশপ্রেমের কবিতা, লর্ড ম্যাকাওলের প্রবন্ধসমগ্র ও ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার বই। নিশ্চিতভাবেই এর মধ্যে কোনো ভারতীয় সাহিত্য ছিল না।
কিন্তু ভারতীয়দের মানসিকতার প্রতি ব্রিটিশদের শ্রদ্ধা ছিল ওটুকুই। ১৯০৪ সালে প্রকাশিত এক বইয়ে হার্বার্ট কম্পটন লিখেছিলেন, ‘একজন হিন্দুর বুদ্ধিকে ঘষেমেজে যতই চকচকে করুন না কেন, তার চরিত্রে সেই নৈতিকতা বা সাহসিকতা গড়ে তোলা সম্ভব নয়, যা সরকারি পদে প্রয়োজন।’
ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিসের অবসরপ্রাপ্ত স্যার বামফিল্ড ফুলার১৮ অবাক হয়ে বলতেন, ‘হিন্দু ছেলেরা দলে দলে ক্লাসরুম ও লাইব্রেরিতে ভিড় করে, পশ্চিমা সাহিত্য ও বিজ্ঞান পড়ে, কিন্তু তারা কেন যেন...সেই ভারতীয় পদ্ধতিই আঁকড়ে ধরে। ভারতীয়রা অতিরিক্ত আবেগপ্রবণ এবং ভীষণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ। ইংরেজরা সব সময় শিক্ষিত ভারতীয়দের কথা ও কাজের মধ্যে অদ্ভুত স্ববিরোধিতা দেখে বিভ্রান্ত হয়, তাদের কাছে মনে হয় কেলেঙ্কারির মতো...। ভারতীয়রা ইউরোপীয় আদর্শের প্রতি সায় দেয়, কিন্তু নিজেদের জীবনযাপনে কোনো পরিবর্তন কর না।’
ব্রিটিশরা ভারতীয়দের যেসব গুণের প্রশংসা করত, তা ছিল অনেকটা প্রশংসা দিয়ে দমিয়ে রাখার মতো। দক্ষিণের দ্রাবিড় জাতি১৯ সম্পর্কে এক ব্রিটিশ লিখেছিলেন, ‘তারা পরিশ্রমী, শান্ত এবং সহনশীল। ইউরোপীয়দের চেয়ে বেশি সংযমী এবং স্বভাবে কম পাশবিক। প্রাণীদের প্রতি দয়া বেশি। চাকুরে হিসেবে ভালো ব্যবহার করলে মালিকের প্রতি তাদের আনুগত্য ইংরেজ চাকুরেদের চেয়ে অনেক বেশি।’
আপাতদৃষ্টিতে প্রশংসা মনে হলেও এগুলো এমন কোনো গুণ ছিল না, যা ভারতীয়দের তাদের ইংরেজ প্রভুদের সমতুল্য করবে। রামানুজনের মেধার প্রতি ব্রিটিশদের সম্মান ছিল, কিন্তু তাঁর চরিত্র ও মেজাজ সম্পর্কে ছিল সন্দেহ। সবকিছুর মাঝে ছিল বিশাল সামাজিক দূরত্ব। এই মিশ্র অনুভূতি নিয়েই ভবিষ্যতে ব্রিটিশরা দেখতে শুরু করবে রামানুজনকে।
