দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ২৪

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

তৃতীয় অধ্যায়

পৃষ্ঠপোষকের সন্ধানে

[১৯০৮ থেকে ১৯১৩]

৭. চিঠি

১৯১২ সাল। মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট অফিসের সবাই বুঝে গেছে, রামানুজন বিশেষ কেউ। নারায়ণা আইয়ার বা রামচন্দ্র রাওয়ের মতো মানুষেরা তা মানতেন। কিন্তু স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং ও অন্য ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মনে দ্বিধা ছিল। তাঁদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, রামানুজন কতটা বিশেষ? তিনি কি আসলেই জিনিয়াস নাকি শুধুই গণিতের জাদুকর? তাঁকে নিয়ে কী করা উচিত?

কেউ ঝুঁকি নিতে চাইছিলেন না। ব্রিটিশরা ভয় পাচ্ছিল, যদি ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তবে ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না। কিন্তু আসল সত্য হলো, তারা জানতই না রামানুজন কেমন জিনিয়াস!

নারায়ণা আইয়ার
ছবি: রাগামি'স কালেকশন, সাউথ ইন্ডিয়া, মাদ্রাস

নারায়ণা আইয়ার অবশ্য জানতেন। তিনি প্রতিদিন রামানুজনের সঙ্গে কাজ করতেন। খুব কাছ থেকে তাঁর ক্ষমতা দেখেছেন। তিনি বুঝলেন, ব্রিটিশদের সমর্থন ছাড়া রামানুজনের প্রতিভার বিকাশ হবে না। তাই তিনি স্যার ফ্রান্সিসের কাছে রামানুজনের হয়ে কথা বলা শুরু করলেন।

রামচন্দ্র রাও নিজের প্রভাব ও পরিচিতি কাজে লাগালেন। তিনিও স্যার ফ্রান্সিসের কানে কথাটা তোলার চেষ্টা করলেন। ১৯১২ সালের ১২ নভেম্বর মাদ্রাজ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের অধ্যাপক গ্রিফিথ একটি চিঠি লিখলেন স্যার ফ্রান্সিসকে। তিনি লিখলেন, ‘আপনার অফিসে পঁচিশ টাকা বেতনের একজন অ্যাকাউন্টেন্ট আছে। তরুণের নাম এস. রামানুজন। সে হয়তো খুব বাজে হিসাবরক্ষক, কিন্তু অসাধারণ গণিতবিদ। আশা করি আপনি তাঁকে শান্তিতে কাজ করার সুযোগ দেবেন, যতদিন না তাঁর প্রতিভা কাজে লাগানোর কোনো উপায় বের হয়।’

নারায়ণা আইয়ার বুঝলেন, ব্রিটিশদের সমর্থন ছাড়া রামানুজনের প্রতিভার বিকাশ হবে না। তাই তিনি স্যার ফ্রান্সিসের কাছে রামানুজনের হয়ে কথা বলা শুরু করলেন।

খুব কম মানুষই রামানুজনের কাজ বুঝতে পারতেন। অধ্যাপক গ্রিফিথ একজনের ওপর ভরসা না করে লন্ডনের আরেক গণিতবিদের পরামর্শ চাইলেন। তাঁর নাম এম. জে. এম হিল। সঙ্গে পাঠালেন রামানুজনের কিছু পেপার। চিঠিতে লিখে দিলেন, ‘রামানুজনের মধ্যে সত্যিই যদি কোনো জিনিয়াস থাকে, তবে তাঁর যত্ন নেওয়া দরকার। তাঁকে বই কেনার টাকা এবং অবসর দিতে হবে’। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থান নিরাপদ রেখে আরও লিখলেন, ‘লন্ডন থেকে উত্তর না আসা পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারছি না, তাঁর পেছনে সময় বা টাকা খরচ করা ঠিক হবে কিনা।’

স্প্রিং পরামর্শের জন্য অনেকের কাছে গেলেন। এ. জি. বোর্ন নামে এক কর্মকর্তা পরামর্শ দিলেন, রামানুজনকে কয়েকজন গণিতবিদের কাছে পাঠাতে। তিনি জানালেন, ‘ভালো গণিতবিদেরা যদি রামানুজনের অধরা প্রতিভা বুঝতে না পারেন, তবে আমি তাঁর প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করব।’

দুই সপ্তাহ পর রামানুজন মাদ্রাজের অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল ডব্লিউ গ্রাহামের সঙ্গে দেখা করলেন। বোর্নের প্রস্তাব দেওয়া দুই গণিতবিদের একজন গ্রাহাম। তিনি খুব সাবধানে রামানুজনের ব্যাপারে মন্তব্য লিখলেন, ‘রামানুজনের মধ্যে বড় গণিতবিদ হওয়ার উপাদান আছে কি না আমি জানি না। তবে তাঁকে দেখে মনে হয় মেধা আছে।’ গ্রাহাম যে খুব সাবধানে শব্দগুলো লিখেছেন, তা বোঝাই যায়। তিনি ভাবলেন, রামানুজন হয়তো সেই সব ছেলেদের মতো যারা খুব দ্রুত অঙ্ক করতে পারে কিন্তু গণিত বোঝে না। এদের বলা হয় ক্যালকুলেটিং বয়। রামানুজন পাটিগণিতে ভালো ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর দক্ষতা শুধু হিসাব কষার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তবুও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের মনে একটা সন্দেহ থেকেই গেল।

এ. জি. বোর্ন জানালেন, ‘ভালো গণিতবিদেরা যদি রামানুজনের অধরা প্রতিভা বুঝতে না পারেন, তবে আমি তাঁর প্রতিভা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করব।’

পরের দিন গ্রিফিথ আবার স্প্রিংকে চিঠি লিখলেন। তিনি জানালেন, ‘অধ্যাপক হিলের মতামতের জন্য তাঁদের অপেক্ষা করা উচিত।’

প্রফেসর হিল ছিলেন গ্রিফিতের পুরোনো শিক্ষক। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজে গ্রিফিতকে পড়াতেন। গাণিতে গবেষণার চেয়ে ছাত্রদের প্রতি ধৈর্য ও যত্নের জন্য তিনি বেশি পরিচিত ছিলেন।

ডিসেম্বরের মাঝামাঝি হিলের উত্তর এল। হিল দুঃখ প্রকাশ করে জানালেন, এই মূহূর্তে তাঁর পক্ষে সব লেখা ভালোভাবে দেখা সম্ভব নয়। তবে একনজর দেখে তিনি কিছু বিষয় বুঝতে পেরেছেন। তিনি জানান, ‘রামানুজনের কাজে কিছু ভুল আছে। তাঁর কিছু ফলাফল হাস্যকর, একদম অযৌক্তিক। এ বিষয়ে আরও জ্ঞান বাড়াতে তিনি ব্রোমউইচের থিওরি অব ইনফিনিট সিরিজ বইটি পড়তে পারেন।’ তিনি রামানুজনের পেপার প্রকাশের ব্যাপারেও সতর্ক করে দিলেন।

ব্রোমউইচের লেখা বই থিওরি অব ইনফিনিট সিরিজ
ছবি: অ্যামাজন ডটইন

তিনি জানান, ‘গবেষণাপত্র খুব পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। কোনো ভুল থাকা যাবে না। প্রতীক ব্যবহার করলে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিতে হবে।’ গ্রিফিথ রামানুজনের বার্নোলি সংখ্যার যে প্রবন্ধ হিলের কাছে পাঠিয়েছিলেন, সেখানে এই সমস্যাগুলো ছিল।

তবে হিলের চিঠিতে মূল প্রশ্নের উত্তর এল না। রামানুজন কি সত্যিই বিশ্বকে দেওয়ার মতো অসাধারণ কিছু সৃষ্টি করেছেন? তাঁর প্রতিভা কেমন? সেই প্রতিভার গভীরতা কতটা? 

হিল শুধু এটুকু বললেন, ‘রামানুজনের কাজ থেকে ভালো কিছু বেরিয়ে আসতে পারে।’ এর বাইরে আর বিশেষ কিছু তিনি যোগ করেননি।

হিল জানান, ‘রামানুজনের কাজে কিছু ভুল আছে। তাঁর কিছু ফলাফল হাস্যকর, একদম অযৌক্তিক। এ বিষয়ে আরও জ্ঞান বাড়াতে তিনি ব্রোমউইচের থিওরি অব ইনফিনিট সিরিজ বইটি পড়তে পারেন।’

কয়েকদিন পর হিল তাঁর সাবেক ছাত্রকে আবার চিঠি লিখলেন। চিঠিটি ছিল অদ্ভুত। এটাই চূড়ান্ত উত্তর ছিল না, তবে এবার তিনি একটু আশার কথা শোনালেন। তিনি বললেন, ‘রামানুজনের বার্নোলি সংখ্যার প্রবন্ধে অনেক ভুল ছিল। কারণ সে কিছু প্রাথমিক বার্নোলি সংখ্যার বৈশিষ্ট্য দেখে ধরে নিয়েছে, সব সংখ্যার ক্ষেত্রে এই বৈশিষ্ট্য খাটবে। কিন্তু সে বিষয়ে তাঁর কাছে (রামানুজন) কোনো প্রমাণ ছিল না। সম্ভবত এ কারণেই লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি ওই প্রবন্ধ প্রকাশ করেনি।’

হিল তবুও বলেন, ‘রামানুজন আসলেই গণিতে আগ্রহী। তাঁর কিছু ক্ষমতাও আছে। কিন্তু তাঁর শিক্ষাগত ঘাটতি তাঁকে আটকে দিচ্ছে। রামানুজনের ব্রোমউইচের বইটি পড়া উচিত।’ এবার তিনি নির্দিষ্ট অধ্যায়ের নামও উল্লেখ করে দিলেন। কোন কোন অধ্যায় পড়লে রামানুজনের ভুল বোঝা বিষয়গুলো পরিষ্কার হবে, জানালেন তা-ও।

এরপর হিল ব্যক্তিগতভাবে একটি বিষয় যোগ করলেন। এটি হয়তো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা। হিল লিখেছেন, ‘১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ সালে তিনি কেমব্রিজে ছাত্র ছিলেন। তখন এই বিষয়গুলো ঠিকভাবে বোঝা যেত না। রামানুজন যে সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো নিয়ে কাজ করেছেন, তা তখনো বোঝা যায়নি। আধুনিক তত্ত্ব তখন সবেমাত্র তৈরি হয়েছে। অনেক বিখ্যাত গণিতবিদও আগের দিনে এই সমস্যায় আটকে গেছেন। তাই রামানুজন নিজে নিজে কাজ করে কিছু ভুল ফল পেয়েছেন। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’

১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ সাল। হিল তখন ক্যামব্রিজের ছাত্র। ঠিক এই সময় জর্জ শোব্রিজ কারও ক্যামব্রিজের ছাত্র ছিলেন। তাঁর লেখা বই পড়েই (সিনোপসিস) রামানুজন গণিত শেখেন। অর্থাৎ, হিলের কথায় বোঝা গেল, রামানুজন সময়ের চেয়ে পিছিয়ে ছিলেন। চল্লিশ বছরে ইউরোপে গণিতের যা উন্নতি হয়েছে, তা তিনি জানতেন না। তিনি তখনো আটকে ছিলেন পুরোনো সময়ে।

হিল তবুও বলেন, ‘রামানুজন আসলেই গণিতে আগ্রহী। তাঁর কিছু ক্ষমতাও আছে। কিন্তু তাঁর শিক্ষাগত ঘাটতি তাঁকে আটকে দিচ্ছে। রামানুজনের ব্রোমউইচের বইটি পড়া উচিত।’

এরপর নিজের পুরনো ছাত্র গ্রিফিথকে প্রায় ভুলেই গেলেন হিল। কিন্তু রামানুজনের কাজ দেখে তিনি আগ্রহী হয়েছিলেন। যদিও রামানুজনকে নিজের ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি। তিনি শুধু দুটি বড় চিঠি লিখে নিজের দায়িত্ব শেষ করেছেন। তিনি রায় দিলেন, ‘রামানুজনের প্রথম পেপারটি প্রকাশের অযোগ্য।’ যদিও রামানুজনের পেপারের সবটা তিনি বুঝতে পারেননি। কিন্তু এ ধরনের পরামর্শ রামানুজন জীবনে কমই পেয়েছেন। এই চিঠি মাদ্রাজের ব্রিটিশদের অনেক সন্দেহ দূর করে দেয়। তারা বুঝতে পারে, রামানুজন আসলেই জিনিয়াস!

অনেকে রামানুজনকে পরামর্শ দিচ্ছিলেন, ভারতে কেউ তাঁকে ঠিকভাবে বুঝবে না। সাহায্যের জন্য তাঁকে কেমব্রিজ বা পশ্চিমের অন্য কোথাও চিঠি লেখা উচিত। এর মধ্যে একজন ছিলেন সিঙ্গারাভেলু মুদলিয়ার। পচাইয়াপ্পা কলেজে পড়ার সময় তিনি রামানুজনের শিক্ষক ছিলেন। আরেকজন ভবনিস্বামী রাও। তিনি কুম্বাকোনম কলেজের শিক্ষক। তৃতীয়জন তাঁর বন্ধু নারসিমা। দুই বছর আগে তার সঙ্গেই পার্ক টাউনে থাকতেন রামানুজন। সম্প্রতি নারায়ণ আইয়ারও সম্ভবত একই পরামর্শ দিয়েছেন।

রামানুজন বুঝতে পারলেন, তাঁকে ইংল্যান্ডের দিকেই ঝুঁকতে হবে। ঘটনাগুলো যেন তাঁকে বলে দিচ্ছিল, বাস্তবে তিনি ভারতীয় গণিতের চেয়ে অনেক বড়! ইউরোপীয় গণিতবিদদের কাছেই হয়তো তিনি সঠিক মূল্যায়ন পাবেন।

ভারত থেকে ইউরোপ অনেক দূর। কিন্তু ডাক ব্যবস্থা ছিল খুব ভালো, সস্তা এবং নির্ভরযোগ্য। ১৯১২ সালের শেষ দিকে রামানুজন আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকলেন। নারায়ণা আইয়ার ও স্যার ফ্রান্সিসের সহায়তায় কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ গণিতবিদদের কাছে চিঠি লিখতে শুরু করলেন। চিঠির সঙ্গে পাঠালেন নিজের কাজের নমুনা।

রামানুজন বুঝতে পারলেন, তাঁকে ইংল্যান্ডের দিকেই ঝুঁকতে হবে। ঘটনাগুলো যেন তাঁকে বলে দিচ্ছিল, বাস্তবে তিনি ভারতীয় গণিতের চেয়ে অনেক বড়!

প্রথমে চিঠি লিখলেন এইচ. এফ. বেকারের কাছে। বেকার ছিলেন রয়্যাল সোসাইটির১০ ফেলো এবং লন্ডল ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির১১ সভাপতি। রামানুজন আশা করেছিলেন, বেকার তাঁকে সাহায্য করবেন বা অন্তত পরামর্শ দেবেন। কিন্তু বেকার তাঁকে ‘না’ বলে দিলেন। হয়তো ভদ্রভাবে বা হয়তো কোনো মন্তব্য ছাড়াই তিনি চিঠি ফেরত দিলেন।

এরপর রামানুজন চিঠি লিখলেন ই ডব্লিউ হবসনের কাছে। তিনিও অনেক বড় মাপের গণিতবিদ। কেমব্রিজের স্যাডলিয়েরিয়ান চেয়ার১২ তখন তাঁর দখলে। কিন্তু তিনিও নাকচ করে দিলেন।

১৬ জানুয়ারি ১৯১৩। রামানুজন আরেকজন কেমব্রিজ গণিতবিদকে চিঠি লিখলেন। তাঁর নাম জি. এইচ. হার্ডি১৩। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এই গণিতবিদ অন্যদের চেয়ে বয়সে ছোট। কিন্তু এরই মধ্যেই ইংল্যান্ডের গণিত জগৎকে নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। হার্ডি কি তাঁকে সাহায্য করতে পারবেন?

হার্ডি লিখলেন, ‘হ্যাঁ’।

চলবে…

টীকা

১. চার্লস গ্রিফিথ মাদ্রাজ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক। তিনি রামানুজনের গাণিতিক ক্ষমতা দেখে মুগ্ধ হন এবং লন্ডনের অধ্যাপক এম. জে. এম. হিলের সঙ্গে রামানুজনের যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। রামানুজনকে উৎসাহ দেওয়া প্রথম দিকের শুভাকাঙ্ক্ষীদের মধ্যে তিনি একজন।

২. এম. জে. এম. হিল লন্ডন ইউনিভার্সিটির ইউনিভার্সিটি কলেজের গণিতের অধ্যাপক। ১৯১২ সালে রামানুজন তাঁকে চিঠি লেখেন। হিল রামানুজনের কাজ দেখে সহানুভূতিশীল হলেও তাঁর প্রতিভার গভীরতা পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। তিনি রামানুজনকে কিছু প্রাথমিক বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন, কিন্তু ছাত্র হিসেবে গ্রহণ করেননি।

৩. এ. জি. বোর্ন মাদ্রাজের ডিরেক্টর অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন। তিনি পেশায় ছিলেন জীববিজ্ঞানী। রামানুজন যখন মাদ্রাজ ইউনিভার্সিটি থেকে বৃত্তির আবেদন করেন, তখন বোর্ন প্রথমে কিছুটা সন্দিহান ছিলেন। পরে অন্যদের সুপারিশে তিনি রামানুজনের জন্য মাসিক ৭৫ টাকার গবেষণা বৃত্তি মঞ্জুর করেন।

৪. ডব্লিউ গ্রাহাম মাদ্রাজের তৎকালীন অ্যাকাউন্টেন্ট জেনারেল। রামানুজনের বৃত্তির ফাইল এবং সরকারি অনুমোদনের প্রক্রিয়ায় তিনিও যুক্ত ছিলেন।

৫. ক্যালকুলেটিং বয় বলতে বোঝায়, যারা অতি দ্রুত বড় বড় অঙ্কের হিসাব করতে পারে। রামানুজন ছোটবেলায় দ্রুত অঙ্ক করতে পারতেন ঠিকই, কিন্তু তিনি ক্যালকুলেটিং বয় ছিলেন না। তিনি ছিলেন গণিতবিদ।

৬. টি.জে. ব্রোমউইচ কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিখ্যাত গণিতবিদ ও অধ্যাপক। তিনি হার্ডির সহকর্মী ছিলেন। তাঁর লেখা বই থেকেই রামানুজন ইনফিনিট সিরিজ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন। তাঁর বিখ্যাত বই অ্যান ইন্ট্রোডাকশন টু দ্য থিওরি অব ইনফিনিট সিরিজ

৭. সংখ্যাতত্ত্বে ব্যবহৃত বিশেষ ধরণের যৌক্তিক সংখ্যার সারি হলো বার্নোলি সংখ্যা। এটি গণিতের খুব জটিল এক বিষয়। রামানুজনের প্রকাশিত প্রথম গবেষণাপত্রটি ছিল এই বার্নোলি সংখ্যার ওপর ভিত্তি করেই লেখা।

৮. জর্জ শোব্রিজ কার পেশায় প্রাইভেট টিউটর ছিলেন। তবে রামানুজনের জীবনে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। তাঁর লেখা সিনোপসিস বইটি হাতে পাওয়ার পরেই রামানুজনের গাণিতিক প্রতিভার বিস্ফোরণ ঘটে। এই বইয়ের হাজার হাজার সূত্র রামানুজন নিজে নিজে সমাধান করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বই আ সিনেপসিস অব এলিমেন্টারি রেজাল্টস ইন পিওর অ্যান্ড অ্যাপ্লায়েড ম্যাথমেটিকস

৯. তৎকালীন সময়ে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থা। ১৯১৩ সালে এই ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমেই রামানুজন ভারত থেকে ইংল্যান্ডে জি. এইচ. হার্ডির কাছে চিঠি ও গাণিতিক সূত্রগুলো পাঠিয়েছিলেন।

১০. ১৬৬০ সালে লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত বিশ্বের প্রাচীনতম ও অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ বিজ্ঞান একাডেমি রয়্যাল সোসাইটি। ১৯১৮ সালে মাত্র ৩০ বছর বয়সে রামানুজন রয়্যাল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন। ভারতীয় হিসেবে এটা ছিল বিশাল অর্জন।

১১. যুক্তরাজ্যের গণিতবিদদের প্রধান সংগঠন লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটি। ১৮৬৫ সালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। রামানুজন ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর এই সোসাইটির সদস্য নির্বাচিত হন এবং তাঁদের জার্নালে তাঁর অনেক গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়।

১২. কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশুদ্ধ গণিত বা পিওর ম্যাথমেটিকসের অধ্যাপকদের জন্য অত্যন্ত সম্মানজনক পদ স্যাডলিয়েলিয়ান চেয়ার। জি. এইচ. হার্ডি তাঁর কর্মজীবনের এক পর্যায়ে এই পদে ছিলেন।

১৩. জি. এইচ. হার্ডি বা গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বখ্যাত গণিতবিদ। তিনি রামানুজনের অগোছালো চিঠির ভেতর লুকিয়ে থাকা অসম্ভব প্রতিভাকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনিই তাঁকে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসেন। হার্ডি ও রামানুজনের জুটি গণিতের ইতিহাসে অন্যতম সেরা জুটি হিসেবে স্বীকৃত। তাঁর বিখ্যাত বই আ ম্যাথমেটিশিয়ানস অ্যাপোলজি