পদার্থবিজ্ঞানের সহজপাঠ ২৫
গ্রীষ্মের দুপুর। প্রখর রোদ। চারপাশ উত্তপ্ত। উত্তপ্ত বালুচর। পাশেই নদী। বালিতে খালি পায়ে হাঁটা মুশকিল। পা পুড়ে ফোস্কা পড়ে যেতে চায়। এবার একটু এগিয়ে যান। নদীর পানিতে পা ডুবিয়ে হাঁটুন, দেখবেন আরাম লাগছে। একই রোদ, একই সময়, তবু বালি আর পানির আচরণে এত তফাত কেন?
এর পেছনের মূল কারণ আপেক্ষিক তাপ। আপেক্ষিক তাপ আসলে একটি মাপকাঠি। কোনো বস্তুর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বা ১ কেলভিন বাড়াতে কতটা তাপ লাগবে, সেটা ঠিক করে দেয় আপেক্ষিক তাপ। প্রতিটি পদার্থের আপেক্ষিক তাপ আলাদা। কিছু পদার্থ খুব অল্প তাপেই গরম হয়ে যায়। আবার কিছু পদার্থকে গরম করতে প্রচুর তাপ দিতে হয়। কেন এমন হয়? সেটার উত্তর লুকিয়ে আছে আপেক্ষিক তাপের আচরণে।
ধরা যাক, ১ কেজি পানি আর ১ কেজি লোহা আছে। দুটোই রাখা আছে একটি ল্যাবরেটরিতে। ল্যাবরেটরির বাতাসের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বাইরে থেকে কোনো তাপ ভেতরে ঢোকার সুযোগ নেই, তেমনি ল্যাবরেটরির ভেতর থেকে কোনো তাপ বেরোতেও পারে না। তাহলে ল্যাবরেটরির ভেতরের সবকিছুর তাপমাত্রাই এখন সমান।
কোনো বস্তুর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি বা ১ কেলভিন বাড়াতে কতটা তাপ লাগবে, সেটা ঠিক করে দেয় আপেক্ষিক তাপ। প্রতিটি পদার্থের আপেক্ষিক তাপ আলাদা। কিছু পদার্থ খুব অল্প তাপেই গরম হয়ে যায়।
পানি ও লোহা উভয়ের ভর সমান, তাপমাত্রাও সমান। এবার দুটোরই তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস করে বাড়াতে হবে। এ জন্য ল্যাম্পের সাহায্যে দুটিকে তাপ দিন। দেখবেন, লোহা খুব দ্রুত গরম হচ্ছে। শিগগিরই লোহার তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে ২৬ ডিগ্রিতে উঠবে। কিন্তু পানির তাপমাত্রা অত সহজে বাড়বে না। বেশ কিছুক্ষণ পর পানির তাপমাত্রা ২৬ ডিগ্রিতে পৌঁছাবে। অর্থাৎ পানির তাপমাত্রা বাড়াতে অনেক বেশি তাপের প্রয়োজন হচ্ছে। পানির আপেক্ষিক তাপ বেশি বলেই এমনটা হচ্ছে। কিন্তু কেন?
কারণ, লোহার আপেক্ষিক তাপ পানির চেয়ে অনেক কম। তাই লোহা দ্রুত গরম হয়। তেমনি ঠান্ডাও হয় দ্রুত। এটি অত্যন্ত তাপ-সক্রিয় পদার্থ। লোহার পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি থাকে। তাপ দিলে পরমাণুগুলো দ্রুত শক্তি লাভ করে, দ্রুতই কাঁপতে শুরু করে। ফলে একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খায়। তাই লোহা দ্রুত উত্তপ্ত হয়। তেমনি উত্তপ্ত লোহাকে ঠান্ডা করাও সহজ।
অন্যদিকে পানির অণুগুলো বেশ দূরে দূরে থাকে। তাপ দিলে এদের অণুগুলোর মধ্যে ধাক্কাধাক্কি শুরু হতে সময় লাগে। তাই পানি গরম হতে সময় লাগে অনেক বেশি। তাপও বেশি লাগে। ওদিকে একবার পানি গরম হয়ে গেলে ঠান্ডা হতেও অনেক বেশি সময় নেয়।
লোহা অত্যন্ত তাপ-সক্রিয় পদার্থ। লোহার পরমাণুগুলো খুব কাছাকাছি থাকে। তাপ দিলে পরমাণুগুলো দ্রুত শক্তি লাভ করে, দ্রুতই কাঁপতে শুরু করে। ফলে একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা খায়।
বালু লোহার মতো অত দ্রুত গরম হয় না, কিন্তু পানির চেয়ে অনেক কম সময় নেয়। তাই পানির তুলনায় বালু দ্রুত গরম হয়। গরম কোনো বস্তুর স্পর্শে আমাদের ত্বক পুড়ে যায়, কষ্ট হয়। কিন্তু গরম বস্তুর চেয়ে কম গরম কোনো বস্তু স্পর্শ করলে আরাম লাগে। তাই গরমের দুপুরে বালুচরে হাঁটতে কষ্ট হলেও পানিতে পা ডুবিয়ে রাখতে বেশ ভালো লাগে। কেন? কারণ, এখানেও ওই একই কথা প্রযোজ্য—পানির আপেক্ষিক তাপ বালুর আপেক্ষিক তাপের চেয়ে অনেক বেশি। তাই বালুর তুলনায় পানি গরম হতে অনেক বেশি সময় লাগে।
ঠিক এই কারণে যেকোনো বস্তু ঠান্ডা করতে পানিই সবার আগে ব্যবহার করা হয়। যেমন, কোনো গরম জিনিস হাত দিয়ে স্পর্শ করলেন, হাত পুড়ে গেল। তখন সবার আগে স্বাভাবিক বা ঠান্ডা পানি ব্যবহার করা উচিত।
গাড়ি বা কলকারখানার ইঞ্জিনে পানির প্রবাহ রাখার ব্যবস্থা করা হয়। কারণ, পানি গরম ইঞ্জিন থেকে তাপ শোষণ করে ইঞ্জিনকে ঠান্ডা রাখে। পানি যদি দ্রুত গরম হতো, তাহলে এর সাহায্যে ইঞ্জিন ঠান্ডা করা এত সহজ হতো না।
বালু লোহার মতো অত দ্রুত গরম হয় না, কিন্তু পানির চেয়ে অনেক কম সময় নেয়। তাই পানির তুলনায় বালু দ্রুত গরম হয়। গরম কোনো বস্তুর স্পর্শে আমাদের ত্বক পুড়ে যায়, কষ্ট হয়।
পুরো আলোচনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—সব বস্তু একই হারে গরম হয় না। যার আপেক্ষিক তাপ যত বেশি, সেই বস্তু তত ধীরে গরম হয়। যার আপেক্ষিক তাপ যত কম, সে তত দ্রুত গরম হয়। তাহলে আপেক্ষিক তাপের সংজ্ঞাটা আমরা এখন লিখে ফেলতে পারি—
১ কেজি ভরের কোনো বস্তুর তাপমাত্রা ১ কেলভিন বাড়াতে যে পরিমাণ তাপ লাগে, সেটাই হলো ওই বস্তুর আপেক্ষিক তাপ।
এটি এসআই পদ্ধতিতে করা হিসাব। এই সংজ্ঞানুসারে আপেক্ষিক তাপের হিসাব-নিকাশ কেলভিন স্কেলে করা হয়। তাই এখানে তাপের একক জুলে হিসাব করতে হবে। অর্থাৎ এসআই পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক হলো Jkg⁻¹ K⁻¹।
এসআই পদ্ধতিতে পানির আপেক্ষিক তাপ = ৪২০০ Jkg⁻¹K⁻¹।
তবে হিসাবটা আমরা সিজিএস পদ্ধতিতেও করে ফেলতে পারি। সে ক্ষেত্রে সংজ্ঞাটা হবে এমন—
১ গ্রাম ভরের কোনো বস্তুর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়াতে যতটুকু তাপ প্রয়োজন, সেটাই হলো ওই বস্তুর আপেক্ষিক তাপ।
সিজিএস পদ্ধতিতে তাপের একক ক্যালরিতে হিসাব করতে হয়। এই পদ্ধতিতে আপেক্ষিক তাপের একক cal g⁻¹ °C⁻¹। সিজিএস পদ্ধতিতে পানির আপেক্ষিক তাপ 1 cal/g/°C বা ক্যালরি/ গ্রাম/°C।