দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি – ২৬

মাদ্রাজের সামান্য কেরানি থেকে কেমব্রিজের ফেলো—শ্রীনিবাস রামানুজনের জীবন যেন এক রূপকথা। দেবী নামাগিরি নাকি স্বপ্নে এসে তাঁকে জটিল সব সূত্র বলে যেতেন! কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই যিনি অসীমকে জয় করেছিলেন। তাঁর এই নাটকীয় জীবন নিয়েই রবার্ট কানিগেল লিখেছেন দ্য ম্যান হু নিউ ইনফিনিটি। রামানুজনের সেই জীবনী ধারাবাহিকভাবে অনুবাদ করছেন কাজী আকাশ।

চতুর্থ অধ্যায়

হার্ডি

[জি.এইচ.হার্ডি থেকে ১৯১৩]

২. হর্সশু লেনের দিনগুলো

১৮৯৬ সাল। হার্ডি ট্রিনিটি কলেজের নতুন ছাত্র। সব ছাত্রকে একটি বিশাল চামড়ায় বাঁধানো খাতায় সই করতে হলো। খাতাটি ১৮৮২ সাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। খাতার মলাট প্রায় আধ ইঞ্চি পুরু। নতুন ব্যাচের সব ছাত্রের নাম লিখতে হয় এই খাতায়। নামের পাশাপাশি লিখতে হয় তারা কে কোন স্কুল থেকে এসেছে। 

বেশির ভাগ ছাত্রই ইটন, হ্যারো কিংবা মার্লবোরোর মতো বিখ্যাত স্কুল থেকে এসেছে। হার্ডি এসেছে উইনচেস্টার স্কুল থেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সবাই নিজের স্কুলের নাম লিখল না। প্রতি পাতায় প্রায় ২৬টি নামের মধ্যে এক-দুটি নামের পাশে কোনো স্কুলের নাম নেই। স্কুলের নামের জায়গায় লেখা ‘প্রাইভেট টিউটর’ বা শুধু ‘প্রাইভেট’। অর্থাৎ তারা কোনো স্কুলে না পড়ে শুধু ঘরে পড়াশোনা করেছে।

উইনচেস্টার স্কুল
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

এই দৃশ্য থেকেই তৎকালীন ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুল ব্যবস্থার একটা চিত্র পাওয়া যায়। ওই সময় ইটন, হ্যারো বা উইনচেস্টারকে বলা হতো পাবলিক স্কুল। কিন্তু সেগুলোতে সবাই পড়তে পারত না। শুধু ধনীদের জন্য ছিল এসব স্কুল। কারণ ওগুলো ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এই স্কুলগুলো শত শত বছরের পুরোনো হলেও উনিশ শতকের শুরুর দিকে রাগবি স্কুলের হেডমাস্টার থমাস আর্নল্ডের সংস্কারের পরেই এগুলো শক্তিশালী সামাজিক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। হার্ডির সময় ইংল্যান্ডের অভিজাত পরিবারের ছেলেদের শরীর, মন ও চরিত্র ঠিক করার জন্য এসব স্কুলে পড়া ছিল অলিখিত নিয়ম।

তবে সেই সময় ইংল্যান্ড ধীরে ধীরে বদলাচ্ছিল। রানী ভিক্টোরিয়ার দীর্ঘ চৌষট্টি বছরের শাসনকালে সমাজে নতুন এক শ্রেণি তৈরি হচ্ছিল। অনেক কৃষক ও ব্যবসায়ী তখন আগের চেয়ে ভালো আয় করতে শুরু করেছেন। কিন্তু তাঁরা চাইলেই ছেলেদের ইটন বা হ্যারোর মতো দামী স্কুলে ভর্তি করতে পারতেন না। আবার গরিবদের জন্য যে সাধারণ গ্রামার স্কুল ছিল, সেটাও তাঁদের পছন্দ ছিল না।

বেশির ভাগ ছাত্রই ইটন, হ্যারো কিংবা মার্লবোরোর মতো বিখ্যাত স্কুল থেকে এসেছে। হার্ডি এসেছে উইনচেস্টার স্কুল থেকে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সবাই নিজের স্কুলের নাম লিখল না।

এই নতুন মধ্যবিত্ত শ্রেণির জন্য কী করা যায়, তা নিয়ে ১৮৫০ ও ১৮৬০–এর দশকে ইংল্যান্ডে অনেক আলোচনা হয়। শেষ পর্যন্ত তাঁদের জন্য তৈরি হয় আলাদা নতুন স্কুল। ইংল্যান্ডের শিক্ষা ব্যবস্থা ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে।

লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমে সারে কাউন্টিতে এমনই একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৩ সালে। নাম ক্র্যানলি স্কুল। শুরুতে এর নাম ছিল সারে কাউন্টি স্কুল। এর প্রতিষ্ঠাকালীন লিফলেটে বলা হয়েছিল, ‘সমাজের ধনী ও অভিজাত শ্রেণির ছেলেরা বড় বড় পাবলিক স্কুলে পড়ার সুযোগ পায়। গরিবদের শিক্ষার উন্নতির জন্যও কিছু কাজ হচ্ছে। কিন্তু কৃষক এবং ব্যবসায়ীদের ছেলেদের শিক্ষা ব্যবস্থা খুব দুর্বল। এমন অবস্থায় মালিকের ছেলের চেয়ে হয়তো মালিকের অধীনে কাজ করা শ্রমিকের ছেলে ভালো শিক্ষা পায়!’

১৮৬৩ সালে লন্ডনের দক্ষিণ-পশ্চিমে সারে কাউন্টিতে ক্র্যানলি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

ক্র্যানলি স্কুলের উদ্দেশ্য ছিল এই বৈষম্য দূর করা। তারা তা করেও দেখিয়েছিল। ১৮৮০ সালের দিকে এই স্কুলে যে ১১৩ জন ছাত্র ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে ৫৫ জন ছিল ব্যবসায়ীর ছেলে, ২০ জন কেরানির ছেলে এবং ১৪ জন কৃষকের ছেলে।

১৮৭১ সাল। এই স্কুলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন ২৯ বছর বয়সী আইজ্যাক হার্ডি। তিনি ভূগোল ও ড্রয়িং শেখাতেন। এর আগে তিনি পড়াতেন লিঙ্কনশায়ারের একটি গ্রামার স্কুলে। তিন বছর পর স্কুল কর্তৃপক্ষ তাঁর বেতন বছরে আরও ৫০ পাউন্ড বাড়িয়ে দেয়। তখনকার দিনে এটা ছিল বিশাল ব্যাপার। কারণ এই টাকা ছিল তাঁর আগের বেতনের অর্ধেকের বেশি! 

১৮৮০ সালের দিকে ক্র্যানলি স্কুলে যে ১১৩ জন ছাত্র ভর্তি হয়, তাদের মধ্যে ৫৫ জন ছিল ব্যবসায়ীর ছেলে, ২০ জন কেরানির ছেলে এবং ১৪ জন কৃষকের ছেলে।

আইজ্যাক হার্ডি তখন বিয়ে করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বিয়ের পরে থাকবেন স্কুল ক্যাম্পাসের বাইরে। ১৮৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি সোফিয়া হলকে বিয়ে করেন। সোফিয়া ছিলেন আইজ্যাকের চেয়ে তিন বছরের ছোট। তিনি ছিলেন লিঙ্কন ডায়োসিসান ট্রেনিং কলেজের সিনিয়র শিক্ষিকা।

জি.এইচ.হার্ডির বাবা আইজ্যাক হার্ডি এবং তাঁর মা সোফিয়া
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

বিয়ের ঠিক এক বছর পরেই সোফিয়া গর্ভবতী হন। ১৮৭৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি জন্ম হয় তাঁদের প্রথম সন্তান—গডফ্রে হ্যারল্ড হার্ডি। দুই বছর পর তাঁর এক বোন হয়, নাম গারট্রুড এডিথ। স্কুলের ঠিক উল্টো দিকে ক্র্যানলি গ্রামের প্রান্তে প্রায় দুই হাজার মানুষের এই ছোট্ট গ্রামেই তাঁরা বড় হতে থাকেন।

সারে কাউন্টির উত্তর সীমানায় ছিল টেমস নদী। নদীটি লন্ডন শহরের ভেতর দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে। ১৮৪০-এর দশকে লন্ডন থেকে রেললাইন বসানো শুরু হলে মাত্র চল্লিশ বছরের মধ্যে সারে কাউন্টির জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ লাখ ৪২ হাজারে পৌঁছায়। জনসংখ্যা বাড়তে থাকে খুব দ্রুত। 

কিন্তু কাউন্টির অন্য প্রান্তের ক্র্যানলি গ্রাম বদলাচ্ছিল ধীরে। ১৮৬৫ সালে ক্র্যানলি পর্যন্ত রেললাইন পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু লন্ডন তখনো দূরত্ব প্রায় ৪০ মাইল। ধনী শিল্পপতিরা এখানে জমি কিনে নতুন প্রাসাদ বানাচ্ছিলেন। তবু হার্ডির ছোটবেলায় ক্র্যানলি ছিল শান্ত ও নিরিবিলি গ্রাম। সেখানে ছিল কাঁচা রাস্তা, উইন্ডমিল, পুরোনো জমিদার বাড়ি ও খড়ের চালের কুঁড়েঘর। আধুনিকতার ছোঁয়া তখনো সেখানকার প্রকৃতি নষ্ট করতে পারেনি।

হার্ডির বাবা-মা সারের ওই পুরোনো আভিজাত্যের অংশ ছিলেন না। তাঁরা এসেছিলেন লন্ডনের ১৫০ মাইল দূর থেকে। তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার মতো টাকা ছিল না। আইজ্যাক হার্ডির বাবা ছিলেন সাধারণ শ্রমিক এবং কারখানার ঢালাই মিস্ত্রি। আর সোফিয়ার বাবা ছিলেন কাউন্টি জেলের কারারক্ষী। তবে মেয়ের বিয়ের সময় তিনি বেকারির কাজ করতেন।

১৮৪০-এর দশকে লন্ডন থেকে রেললাইন বসানো শুরু হলে মাত্র চল্লিশ বছরের মধ্যে সারে কাউন্টির জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে ৩ লাখ ৪২ হাজারে পৌঁছায়। জনসংখ্যা বাড়তে থাকে খুব দ্রুত। 

হার্ডির বাবা-মা অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন। তাঁরা জীবনটাকে বদলাতে চেয়েছেন। শিক্ষকতা পেশায় এসে সেই সাধারণ অবস্থান থেকে কিছুটা ওপরে উঠে একাডেমিক জগতে নিজেদের একটা ছোট্ট জায়গা করে নেন।

সি. পি. স্নোর বর্ণনায় আইজ্যাক হার্ডি ছিলেন শান্ত, ভদ্র, স্নেহশীল এবং কিছুটা অগোছালো মানুষ। তাঁর মধ্যে একধরনের শিশুসুলভ ভদ্রতা ছিল। সম্ভবত তিনি সুখী মানুষ ছিলেন। সঙ্গীতের প্রতি তাঁর ছিল গভীর টান। স্কুলের গানের ক্লাসে তিনি ছিলেন প্রধান গায়ক। সপ্তাহে দুবার গানের তালিম দিতেন। স্কুল ম্যাগাজিন সম্পাদনা করতেন, ফুটবল খেলতেন এবং যুক্ত ছিলেন বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে। রয়্যাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সদস্যও ছিলেন। ৫৯ বছর বয়সে তিনি মারা গেলে পুরো গ্রাম তাঁর জন্য শোক পালন করে। বন্ধ রাখা হয় হাই স্ট্রিটের সব দোকানপাট।

সি. পি. স্নোর বর্ণনায় হার্ডির বাবা আইজ্যাক হার্ডি ছিলেন শান্ত, ভদ্র, স্নেহশীল এবং কিছুটা অগোছালো মানুষ
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

প্রধান শিক্ষক তাঁর সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি কাউকে কষ্ট দেননি, কারও শত্রুও ছিলেন না। এমনকি কোনো প্রাণীকেও তিনি কষ্ট দিতেন না।’ 

কথাগুলো শুনে ভিক্টোরিয়ান যুগের বাড়িয়ে বলা আবেগ মনে হতে পারে। কিন্তু হ্যারল্ডের ছোটবেলার একটি ছবিতে তাঁর বাবার চেহারা দেখলে সেটা বিশ্বাস হয়। ছবিতে দেখা যায় উজ্জ্বল চোখের একজন মানুষকে। তাঁর চুলগুলো পাতলা, গালে ঘন দাড়ি। সাধারণত ঘন দাড়িতে মানুষকে রাগী দেখায়, কিন্তু আইজ্যাক হার্ডিকে লাগছিল একদম সান্তা ক্লজের মতো কোমল।

প্রধান শিক্ষক আইজ্যাক হার্ডি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘তিনি কাউকে কষ্ট দেননি, কারও শত্রুও ছিলেন না। এমনকি কোনো প্রাণীকেও তিনি কষ্ট দিতেন না।’ 

এর ঠিক উল্টো চরিত্র ছিল হার্ডির মায়ের। একই সময়ে তোলা সোফিয়া হলের একটি ছবিতে ভিক্টোরিয়ান যুগের সেই গুমোট গাম্ভীর্য ফুটে উঠেছে। ছবিতে দেখা যায়, তিনি জমকালো এমব্রয়ডারি করা পোশাক পরে আছেন। চুল আঁচড়ে মাথার পেছনে স্তূপ করে রাখা। তাঁর ঠোঁট ছোট, কোণগুলো একটু নিচের দিকে বাঁকানো। চোখে এক ধরণের চকিত দৃষ্টি। এই দৃষ্টি তাঁর ছেলে হার্ডির মধ্যেও দেখা যেত।

রামানুজনের মায়ের মতো হার্ডির মা-ও ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপরায়ণ। রোববারে তিনি হ্যারল্ড ও গারট্রুডকে জোর করে ২-৩ বার গির্জায় নিয়ে যেতেন। ১৮৭৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি যখন বিয়ের জন্য চাকরি ছাড়েন, তখন তাঁকে কলেজ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয় ধর্মীয় বোধ, খ্রিস্টানসুলভ আচরণ, শৃঙ্খলা, অঙ্ক শেখানোর দক্ষতা ও কোমল অথচ দৃঢ় শাসনের জন্য। সব মিলিয়ে সোফিয়া ছিলেন কঠোর, সোজাসাপটা ও অত্যন্ত দক্ষ নারী। 

স্বামীর মতো তাঁরও সংস্কৃতির প্রতি ঝোঁক ছিল। তিনি পিয়ানো শেখাতেন, কনসার্টে যেতেন। হ্যারল্ডের বয়স যখন মাত্র এক বছর, তখন তিনি স্কুলে হান্ডেলের মেসিয়াহ দেখতে যান। শিক্ষক দম্পতি হিসেবে তাঁরা তাঁদের সাধারণ বংশপরিচয়কে ছাপিয়ে এক শিল্প ও শিক্ষার জগৎ তৈরি করেন। আর এখন বাবা-মা হিসেবে তাঁরা নিজেদের সন্তানদের শিক্ষার ব্যাপারে ভীষণ সিরিয়াস ও যত্নবান।

তাঁরা সফল হয়েছিলেন। অন্তত মেধার দিক থেকে সন্তানেরা তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করেছিল।

১৮৭৪ সালের ডিসেম্বরে সোফিয়া যখন বিয়ের জন্য চাকরি ছাড়েন, তখন তাঁকে কলেজ থেকে ধন্যবাদ জানানো হয় ধর্মীয় বোধ, খ্রিস্টানসুলভ আচরণ, শৃঙ্খলা, অঙ্ক শেখানোর দক্ষতা জন্য।

১৮৯১ সালের মে মাসে হার্ডির বোন গারট্রুড সেন্ট ক্যাথারিনস স্কুলে ভর্তি হয়। এটি ছিল ক্র্যানলি স্কুলেরই মেয়েদের শাখা। তাঁদের বাসা থেকে মাত্র পাঁচ মাইল দূরে ব্রামলিতে ছিল সেই স্কুল। সেখানে সে ড্রয়িং এবং ল্যাটিনে ভালো ফলাফল করে পুরস্কার পান। ১৯০৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন থেকে বি.এ পাস করে তিনি নিজের স্কুলেই ফিরে আসেন আর্ট মিস্ট্রেস হিসেবে। এরপর জীবনের বেশির ভাগ সময় তিনি সেখানেই কাটান।

হার্ডির বোন গারট্রুড
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

১৯২৬ সালে স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হন তিনি। ম্যাগাজিনে থাকত কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ। সাধারণ স্কুল ম্যাগাজিনের চেয়ে এর মান অনেক ভালো ছিল। তাঁর নিজের লেখা সম্পাদকীয়গুলো ছিল চমৎকার। তিনি প্রচুর কবিতা লিখতেন। সেগুলোতে সাহিত্য ও পাণ্ডিত্যের ছাপ ছিল স্পষ্ট। কিছু ছাত্রীর বোকামি দেখে বিরক্ত হয়ে তিনি একবার একটি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা লিখেছিলেন:

এক যে মেয়ে

সহ্য করা দায়,

নামটি কি তার?

থাক না গোপন,

লজ্জা যদি পায়।

শিখতে হবে ভদ্রতা

কায়দা-কানুন ঢের,

হঠাৎ যদি পিতামাতার

সঙ্গে দেখা হয়!

. . .

সে বলে, ভাই,

অঙ্ক কভু আসে না মোর মাথায়

বাবা যখন কাঁচা ছিল স্কুলে

যোগ-বিয়োগও পারত না সে হেথায়!

ইচ্ছে করে কই—

তোর বাবা যে গাধার মতো

মূর্খ ছিল ওই!

ডিকটেশনে মাইনাস দুই;

ক্রিয়াপদের আগামাথা

পাই না কোনো দেখা;

ভবিষ্যৎ কাল লিখতে গিয়ে

ভুলভাল সব লিখি,

‘রেগো’-র বদলে ‘রেগিবো’

বানান করে শিখি।

মা কলম ধরে

লিখতে পারে নাকো,

বিদেশি ওই ভাষার বুলি

বলল কবে কাকে?

ওরে বাছা, জগৎটা আজ

হতো যে সুন্দর,

অল্প বয়সে মরেই যেত

পিতামাতা তোর!

কতটা বিরক্তি ও জ্ঞানতৃষ্ণা থাকলে একজন শিক্ষক এমন কবিতা লিখতে পারেন! হার্ডির বাবা-মা সন্তানদের ওপর শিক্ষার যে প্রভাব ফেলেছিলেন, তা ছিল এমনই তীব্র।

১৯২৬ সালে স্কুল ম্যাগাজিনের সম্পাদক হন হার্ডির বোন গারট্রুড। ম্যাগাজিনে থাকত কবিতা, গল্প ও প্রবন্ধ। সাধারণ স্কুল ম্যাগাজিনের চেয়ে এর মান অনেক ভালো ছিল।

সি. পি. স্নো হার্ডির বাবা-মাকে একটু বেশিই কড়া বলেছেন। হ্যারল্ড এবং তাঁর বোনের কোনো গৃহশিক্ষক ছিল না। একজন নার্স তাঁদের পড়তে ও লিখতে শেখান। তাঁদের খুব বেশি বই ছিল না, কিন্তু যেগুলো ছিল সবই ছিল ভালো বই। ছোটবেলায় হ্যারল্ড বোনকে ডন কিহোতে এবং গালিভার্স ট্রাভেলস পড়ে শোনাতেন।

তাঁদের কখনোই ভাঙা খেলনা দিয়ে খেলতে দেওয়া হতো না, সবকিছুতে যেন একটা অদৃশ্য মানদণ্ড ঠিক করা ছিল। সবকিছু হতে হবে নিখুঁত এবং সেরা। এই অদৃশ্য মানদণ্ডের নিচে যেসব জিনিস পড়বে, তা বাতিল করতে হবে।

হার্ডির বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই তিনি লাখের ঘর পর্যন্ত সংখ্যা লিখতে পারতেন। এটা সাধারণত গাণিতিক প্রতিভারই লক্ষণ। গির্জায় গেলে তিনি প্রার্থনার ক্রমিক নম্বরগুলোর উৎপাদক বের করতেন। যেমন, ৮৪ নম্বর গানের উৎপাদক ২ × ২ × ৩ × ৭!

জি.এইচ.হার্ডি
ছবি: মাস্টার অ্যান্ড ফেলোস অব ট্রিনিটি কলেজ, কেমব্রিজ

স্কুলে হার্ডি নিয়মিত গণিত ক্লাস করতেন না। তাঁকে আলাদাভাবে পড়াতেন ইউস্টেস থমাস ক্লার্ক। তিনি স্কুলের গণিত বিভাগের প্রধান ছিলেন। ক্লার্ক কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজ থেকে সদ্য পাস করে এসেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন র‍্যাঙ্গলার, মানে কেমব্রিজের গণিত শিক্ষার্থীদের সেরাদের মধ্যে একজন। তাঁর মধ্যে অসাধারণ শক্তি ও উদ্যম ছিল। সেই শক্তি তিনি সঞ্চার করেন হার্ডির মধ্যেও।

শুধু গণিত নয়, হার্ডি যেখানে হাত দিতেন, সেখানেই সোনা ফলত। কিন্তু তাঁর দুর্বলতা ছিল, তিনি খুব লাজুক। নিজেকে নিয়ে সবসময় সংকোচে ভুগতেন। পুরস্কার নিতে কখনো পুরো স্কুলের সামনে স্টেজে উঠতে চাইতেন না। মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে ভুল উত্তর দিতেন, যাতে ক্লাসে প্রথম হয়ে সামনে যেতে না হয়! বন্ধু স্নো পরে বলেছেন, ‘সে ছিল অতিরিক্ত নাজুক। যেন তার চামড়ার ওপরের তিনটে স্তরই নেই, তাই সবকিছুতেই তার বেশি লাগে।’

হার্ডির বয়স যখন মাত্র দুই বছর, তখনই তিনি লাখের ঘর পর্যন্ত সংখ্যা লিখতে পারতেন। এটা সাধারণত গাণিতিক প্রতিভারই লক্ষণ। গির্জায় গেলে তিনি প্রার্থনার ক্রমিক নম্বরগুলোর উৎপাদক বের করতেন।

তাঁর বোন গারট্রুডও ছিলেন এরকমই। তিনি সেন্ট ক্যাথারিনস স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর বলেছিলেন, ‘আমি খুব লাজুক ছিলাম। যে পরিবেশে বড় হয়েছি, তা ওই বয়সের মেয়েদের স্কুলের জন্য খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না।’ এই পরিবেশ তাঁদের দুজনকেই আজীবন আঁকড়ে ছিল। তাঁরা কেউ কখনো বিয়ে করেননি। দুজনেই সারাজীবন কাটিয়েছেন শিক্ষার পরিবেশে। দুজনেই ছিলেন বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের বাসিন্দা।

হার্ডির বোন গারট্রুডও একইরকম ভাবতেন। শেষ বয়সে নার্সিং হোমে থাকার সময় তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি কোন ধর্মের মানুষ। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন ‘মোহাম্মেডান’ (মুসলমান)! শুধু তাই নয়, তিনি আফসোস করে বলেছিলেন, কাছেপিঠে কোনো মসজিদ নেই। এমনকি অভিনয়ের খাতিরে একটা জায়নামাজ জোগাড় করার চেষ্টাও করেছিলেন!

১৯২০-এর দশকে সেন্ট ক্যাথারিনস স্কুলের শিক্ষকদের একটা ছবিতে দেখা যায়, ২০ জন শিক্ষকের সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন, শুধু একজন বাদে। তিনি গারট্রুড। তিনি তাকিয়ে আছেন ক্যামেরার বাঁ দিকে, নিজের মুখের বাঁ পাশটা আড়াল করে। ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলার সময় হার্ডির হাতের ব্যাটের আঘাতে তাঁর এক চোখ নষ্ট হয়ে যায়। সারা জীবন তাঁকে কাঁচের চোখ পরতে হয়েছে। কিন্তু এই দুর্ঘটনা তাঁদের ভাই-বোনের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারেনি; বরং তাঁরা আরও কাছাকাছি ছিলেন। তাঁরা যমজ ভাই-বোনের মতো একে অপরের খোঁজ রাখতেন এবং বহু বছর লন্ডনে একই অ্যাপার্টমেন্টে ছিলেন।

১৮৮০ সাল। হার্ডির বয়স মাত্র তিন বছর। ওই বছর ক্র্যানলি স্কুলের বোর্ড সিদ্ধান্ত নেয়, স্কুলের সবচেয়ে ছোট ২৪ জন ছাত্রকে আলাদা রাখা হবে। তাদের জন্য রাস্তার উল্টো দিকের সিক হাউস ঠিক করা হলো। একসময় অসুস্থ রোগীরা এই ঘরে থাকত। এতে মূল স্কুলের ভেতরে জায়গা খালি হবে, এবং স্কুলের ফাকা জায়গা বাড়বে। এর দায়িত্ব দেওয়া হয় মিস্টার ও মিসেস হার্ডিকে। তাঁদের সাহায্য করবেন একজন গভর্নেস।

১৯২০-এর দশকে সেন্ট ক্যাথারিনস স্কুলের শিক্ষকদের একটা ছবিতে দেখা যায়, ২০ জন শিক্ষকের সবাই ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে আছেন, শুধু একজন বাদে। তিনি গারট্রুড।

এই নতুন স্কুলটিকে বলা হতো একটি প্রিপারেটরি স্কুল। আগে হয়তো কোনো না কোনোভাবে এর অস্তিত্ব ছিল, তবে এবার সেটাকে আলাদা করে চালানো শুরু হলো। স্কুলের হিসাবের খাতাও একে আলাদা করা শুরু হলো। ১৮৮১ সালে মিসেস হার্ডি এই দায়িত্বের জন্য ২৮১ পাউন্ড ১২ শিলিং পেয়েছিলেন। এই টাকা দিয়েই হয়তো ওই হাউসের খরচ চালাতেন তিনি।

১৮৮১ সালের দিকে হার্ডির বয়স যখন চার বছর, তখন তাঁরা থাকতেন এই হাউসের একটু নিচে, রাস্তার দিকে। বাড়িটি ছিল ছোট, দোতলা। ইটের তৈরি বাড়িটি পাশাপাশি জোড়া লাগানো ছিল। সারে কাউন্টিতে সতেরো শতক থেকে প্রচলিত লাল ও কালো টাইলসের কারুকাজ ছিল বাড়িটিতে। নিচতলায় ছিল নিচু ছাদের বসার ঘর ও রান্নাঘর। সেখানে ছিল ইটের তৈরি বড় ফায়ারপ্লেস। বসার ঘর থেকে রাস্তার ওপারে স্কুলের ক্লক টাওয়ার ও চ্যাপেলের জানালা দেখা যেত।

আদমশুমারির রেকর্ড বলছে, ১৮৮১ সালে ওই ছোট্ট কটেজে গাদাগাদি করে আটজন মানুষ থাকত! হ্যারল্ড, তাঁর বাবা-মা ও বোন ছাড়াও সেখানে ছিলেন ৩০ বছর বয়সী এলিজা ডেন্টন (তিনি মিসেস হার্ডিকে হাউসে সাহায্য করতেন), ২২ বছর বয়সী ক্যাথরিন মেনার্ড (সম্ভবত বাচ্চাদের নার্স), ১৮ বছর বয়সী পরিচারিকা অ্যালিস লি এবং ৩৮ বছর বয়সী বিধবা পরিচারিকা লরা চ্যান্ডলার। এখনকার দিনে এ কথা ভাবলে দম বন্ধ হয়ে আসার কথা!

ফায়ারপ্লেসের অন্য পাশে, দেয়াল ঘেঁষা একই রকম আরেকটি বাড়িতে থাকত এক কৃষি শ্রমিকের পরিবার। সেখানে সদস্য সংখ্যা ছিল আরও বেশি। শ্রমিক, তাঁর স্ত্রী, শ্বশুর, দুই কর্মক্ষম ছেলে এবং ৪ মাস থেকে ১১ বছর বয়সী আরও ৬ জন বাচ্চা!

১৮৮১ সালের দিকে হার্ডির বয়স যখন চার বছর, তখন তাঁরা থাকতেন এই হাউসের একটু নিচে, রাস্তার দিকে। বাড়িটি ছিল ছোট, দোতলা। ইটের তৈরি বাড়িটি পাশাপাশি জোড়া লাগানো ছিল।

সেই তুলনায় হার্ডিদের বাড়িতে মাত্র দুটি বাচ্চা থাকায় সেটাকে হয়তো মিসেস হার্ডির চোখে খালিই মনে হতো! তাই সংসারের টানাটানি সামলাতে তাঁরা বেসমেন্টের ঘরগুলো স্থানীয় চাকরদের ভাড়া দিতেন। দিনে সবাই কাজে চলে গেলে হ্যারল্ড ও তাঁর বোন থাকতেনমিস মেনার্ডের কাছে।

হর্সশু লেনের অন্যান্য কৃষক বা শ্রমিকদের তুলনায় হার্ডিরা ভালো ছিলেন। কিন্তু আইজ্যাকের সামান্য বেতনে তাঁদের অবস্থাও খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। স্কুলের একজন হেডমাস্টার বছরে ১০০০ পাউন্ড বেতন পেতেন। তখন সাধারণ শ্রমিকদের উপার্জন ছিল ৬০-৭০ পাউন্ড। উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণির আয় ছিল প্রায় তিন শ পাউন্ড। কিন্তু স্কুলের দ্বিতীয় শিক্ষক পেতেন মাত্র ১০০ পাউন্ড। ফলে সহকারী শিক্ষক হিসেবে হার্ডির বাবা নিশ্চিয়ই আরও কম বেতন পেতেন।

হার্ডির শৈশব কেটেছিল একেবারে টিপিক্যাল ভিক্টোরিয়ান নার্সারিতে। ছয় বছর বয়সের এক ছবিতে তাঁকে দেখা যায় ভিক্টোরিয়ান আমলের সেই চিরচেনা নাবিকদের পোশাক ও বো-টাই পড়া। তিনি এমন এক রাস্তার পাশে বড় হয়েছেন, যা কয়েক বছর আগেও ছিল কাদামাখা পথ। 

ক্র্যানলি স্কুলের পরিবেশটা ছিল অন্যরকম। ইংল্যান্ডের অভিজাত মানুষের ছেলেরা এখানে আসত না। এখান থেকে তেমন অভিজাত মানুষ তৈরিও হতো না। ১৮৭৫ সালে এক পরিদর্শক লিখেছিলেন, ‘ক্র্যানলির ছেলেরা যেখানে খুশি ঘুরে বেড়াতে পারে। এই স্বাধীনতা পুরো প্রতিষ্ঠানের বৈশিষ্ট্য।’ এখানে পাবলিক স্কুলের মতো কঠোর নিয়ম ছিল না। ছেলেরা পাইপ টানত, জিমের পেছনে আড্ডা দিত। ১৮৮৮ সাল পর্যন্ত শিক্ষকরাও ছাত্রদের সঙ্গে একই দলে খেলতেন। রাস্তার শেষে দাঁড়িয়ে থাকা লাল ইটের স্কুল ভবনগুলো দেখতে সুন্দর হলেও সেখানে পুরোনো পাবলিক স্কুলগুলোর মতো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গাম্ভীর্য ছিল না।

সি. পি. স্নো লিখেছেন, ‘হার্ডির শৈশব ছিল আলোকিত, সংস্কৃতিমনা এবং অত্যন্ত শিক্ষিত...। তিনি জানতেন, সুবিধা মানে কী এবং তিনি তা পেয়েছিলেন।’ ঘরে তিনি অভিজাতদের মতো শিক্ষার পরিবেশ পেয়েছেন, কিন্তু স্কুলে ছিলেন সাধারণের কাতারে। এই অদ্ভুত মিশ্রণের মধ্যে বড় হয়েছেন হার্ডি। মানে অর্থনৈতিকভাবে তিনি সাধারণ, কিন্তু সাংস্কৃতিকভাবে ধনী। তিনি একদিকে যেমন মেধার পূজারী ছিলেন, অন্যদিকে সামাজিকভাবে অবহেলিতদের প্রতি ছিলেন সংবেদনশীল।

হার্ডির শৈশব কেটেছিল একেবারে টিপিক্যাল ভিক্টোরিয়ান নার্সারিতে। ছয় বছর বয়সের এক ছবিতে তাঁকে দেখা যায় ভিক্টোরিয়ান আমলের সেই চিরচেনা নাবিকদের পোশাক ও বো-টাই পড়া।

১৮৮৯ সালের জুলাই মাসে কেমব্রিজের সেন্ট জনস কলেজের ফেলো জে. টি. ওয়ার্ড ক্র্যানলি স্কুলের হেডমাস্টারকে পরীক্ষার রিপোর্ট পাঠান। এই স্কুলে বয়সের হিসেবে ক্লাস ঠিক হতো না, হতো মেধার হিসেবে। হার্ডি মাত্র ১২ বছর বয়সেই ষষ্ঠ ফর্মে (সর্বোচ্চ ক্লাসে) উঠে যান। সেখানে ২০ বছর বয়সী ছাত্ররাও ছিল। ওয়ার্ড লিখেছেন, ‘হার্ডি জ্যামিতি, বীজগণিত ও ত্রিকোণমিতিতে সবার চেয়ে সেরা।’ হার্ডি তখনো মেকানিকস পড়েননি, কিন্তু তাঁর মেধা দেখে ওয়ার্ড ভবিষ্যদ্বাণী করলেন, ‘এই ছেলে ভবিষ্যতে অনেক নাম করবে।’

নাম তিনি করেছিলেন। ক্র্যানলি স্কুল তাঁকে যা দেওয়ার দিয়েছিল। ১২ বছর বয়সে তিনি এই স্কুলের সীমানা ছাড়িয়ে গেলেন। তাঁর উচ্চাকাঙ্ক্ষী বাবা-মা তখন স্কলারশিপের খোঁজ করছেন। সে কালে গণিতের সবচেয়ে বিখ্যাত স্কুল ছিল উইনচেস্টার। সেখানে স্কলারশিপ পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। ১৮৬০-এর দশকে একবার ৭টি সিটের জন্য লড়াই করেছিল ১৩৭ জন।

১৮৯০ সালে ১০২ জন প্রার্থীর মধ্যে পরীক্ষা দিয়ে প্রথম হন হার্ডি।

১৮৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ক্র্যানলি স্কুল তার পুরোনো খোলামেলা, শান্ত-সহজ ভাব হারাতে শুরু করেছে। হার্ডির বাবা স্কুলের হিসাবরক্ষক হয়েছেন। তাঁর পরিবার উঠেছে কনেল নামে একটি বড় বাড়িতে। কিন্তু ততদিনে ছোট্ট গ্রামের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর পৃথিবীর পথে পা বাড়িয়েছেন ছোট্ট হ্যারল্ড।  

চলবে…

টীকা

১. থমাস আর্নল্ড ব্রিটিশ পাবলিক স্কুলে কড়া নিয়মকানুন ও শৃঙ্খলা চালু করেন। এর আগে স্কুলগুলো ছিল বিশৃঙ্খল। তিনি সেখানে ভদ্রতা, নৈতিকতা ও চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। তাঁর দেখানো পথেই পরে হার্ডির স্কুলগুলো চলত।

২. রানি ভিক্টোরিয়া ব্রিটেনের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রানি। তিনি ১৮৩৭ থেকে ১৯০১ সাল পর্যন্ত ৬৪ বছর রাজত্ব করেন। তাঁর সময়কালকে বলা হয় ভিক্টোরিয়ান যুগ। হার্ডির জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই রানির আমলেই। তখন ব্রিটেন ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ।

৩. হার্ডির প্রথম স্কুল এটি। ইটন বা হ্যারোর মতো ধনীদের স্কুল নয়। এটি তৈরি হয়েছিল কৃষক ও মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ীদের ছেলেদের জন্য। তারা খুব ধনীও নয়, আবার খুব গরিবও নয়। পরিবারের মেধাবী ছেলেদের ভালো লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়াই ছিল এই স্কুলের উদ্দেশ্য।

৪. ইংল্যান্ডে তখন তিন শ্রেণির মানুষ ছিল। অভিজাত ধনী, শ্রমিক বা গরিব এবং কৃষক বা ব্যবসায়ী। ধনীরা সন্তানদের ইটন, হ্যারো বা উইনচেস্টারের মতো নামকরা ও ব্যয়বহুল পাবলিক স্কুলে পাঠাত। এদের শিক্ষার মান ছিল সেরা। গরিবদের জন্য বেশ কিছু দাতব্য স্কুল ছিল। সরকার এবং চার্চ চেয়েছিল গরিবরা যেন অন্তত বাইবেল পড়তে পারে। তাই নামমাত্র মূল্যে বা বিনামূল্যে শ্রমিকদের সন্তানদের জন্য এই স্কুলগুলোয় পড়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু সমস্যা ছিল মধ্যবিত্তদের নিয়ে। পাবলিক স্কুলে পড়ার মতো অঢেল টাকা তাদের ছিল না। আবার সামাজিক সম্মানের ভয়ে গরিব শ্রমিকের ছেলের সঙ্গেও স্কুলে পাঠাতে চাইতেন না। এই অবস্থায় মধ্যবিত্তের সন্তানদের যাওয়ার কোনো জায়গা ছিল না। শ্রমিকের ছেলে দাতব্য স্কুলে গিয়ে পড়ালেখা শিখছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীর ছেলে ভালো স্কুলের অভাবে বাড়িতে বসে থাকত বা এমন কোনো নিম্নমানের প্রাইভেট টিউটরের কাছে পড়ত, যার হয়তো নিজেরই বিদ্যে নেই।

৫. ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত নদী টেমস নদী। এই নদীর তীরেই লন্ডন শহর গড়ে উঠেছে। হার্ডির গ্রামের কাছেই সারে কাউন্টির সীমানা দিয়ে এই নদী বয়ে গেছে। লন্ডনের প্রাণ বলা হয় এই নদীকে।

৬. হান্ডেলের মেসিয়াহ হলো বিখ্যাত জার্মান সুরকার জর্জ ফ্রিডরিখ হান্ডেলের তৈরি একটি কালজয়ী অর্কেস্ট্রা। এর ‘হাল্লেলুয়াহ’ কোরাসটি বিশ্ববিখ্যাত। হার্ডির মা গানপাগল ছিলেন, তাই মাত্র এক বছর বয়সে হার্ডিকে কোলে নিয়ে তিনি এই কনসার্ট দেখতে গিয়েছিলেন।

৭. ডন কিহোতে স্প্যানিশ লেখক মিগেল দে সার্ভান্তেসের লেখা বিশ্ববিখ্যাত ক্লাসিক উপন্যাস। এক বুড়ো নিজেকে বীরযোদ্ধা ভেবে উইন্ডমিলের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যান। মূল গল্পটা এটা নিয়েই। হার্ডি ছোটবেলায় তাঁর বোনকে এই বিখ্যাত বইগুলো পড়ে শোনাতেন।

৮. জোনাথন সুইফটের লেখা দারুণ এক অ্যাডভেঞ্চার গল্প গালিভার ট্রাভেলস। গালিভার নামের এক লোক জাহাজডুবি হয়ে বিচিত্র সব দেশে গিয়ে পড়ে। কখনো লিলিপুট বা বামনদের দেশে, কখনো দৈত্যদের দেশে। ছোটদের খুব প্রিয় এই বইটি হার্ডি শৈশবেই পড়ে ফেলেছিলেন।

৯. গণিতের একটি বিষয় উৎপাদক। কোনো সংখ্যাকে ভেঙে যে ছোট ছোট সংখ্যা পাওয়া যায়, যা দিয়ে ওই সংখ্যাটিকে নিঃশেষে ভাগ করা যায়, সেগুলোই উৎপাদক। যেমন—৬ সংখ্যাটির উৎপাদক হলো ২ এবং ৩। কারণ ৬-কে ২ ও ৩ সংখ্যা দিয়ে ভাগ করা যায়। মাত্র দুই বছর বয়সী ছোট্ট হার্ডি চার্চে বসে বসে গানের নম্বরগুলোকে এভাবে মনে মনে উৎপাদকে বিশ্লেষণ করতেন।